খুঁজুন

“নৌকার মাঝিও কুড়াতে চায় ধান”

নিজস্ব প্রতিবেদক, আড়াইহাজার।
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ণ
“নৌকার মাঝিও কুড়াতে চায় ধান”

“রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই”—এই বহু পুরোনো চর্বিতচর্বণ উক্তিটির বাস্তব মহড়া যেন দেখা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ৯ নং হাইজাদী ইউনিয়ন পরিষদের আগাম নির্বাচনি হাওয়ায়। ক্ষমতার পালাবদলের পর পুরো দেশের মতো হাইজাদী ইউনিয়নের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সমপ্রকৃতির প্রার্থীরাও বদলেছেন নিজেদের খোলস। তবে সব আলোচনা ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. এখলাস উদ্দিন ভূঁইয়া (লিটন)। অতীতে যিনি ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ বলয়ের অন্যতম চালিকাশক্তি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনিই এখন বিএনপি সমর্থিত ভোটারদের মন জয় করতে এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে বেশ মরিয়া। স্থানীয় রাজনীতি সচেতন নাগরিকরা তাই রসিকতা করে পুরো ঘটনাকে এক লাইনে নাম দিয়েছেন—”নৌকার মাঝি কুড়াতে চায় ধান”।

বিগত বছরগুলোতে আড়াইহাজারের স্থানীয় রাজনীতিতে তৎকালীন সংসদ সদস্যের ক্ষমতার প্রভাব ছিল সর্বব্যাপী। সেই বলয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এখলাস উদ্দিন লিটন। ইউনিয়ন লেভেলের দলীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, বড় বড় জনসভা আয়োজন, প্রশাসনিক নানান তদবির থেকে শুরু করে এমপির প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়ার মতো পাশে থাকা—সবখানেই দেখা গেছে তাঁর দাপুটে উপস্থিতি। নৌকার প্রভাবে বলীয়ান হয়ে সেসময় এলাকায় তিনি তৈরি করেছিলেন নিজ প্রভাববলয়।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার পটবদলের পর রাতারাতি উল্টে যায় স্থানীয় রাজনীতির চিত্রপট। আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে গেলেও বা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, কৌশল বদলে মাঠে রয়ে গেছেন লিটন। হাইজাদী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ের হিসাব মেলাতে তিনি এখন অতীত পরিচয়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ‘জনগণের প্রার্থী’ ও বিএনপি ঘরানার ভোটারদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জনসেবার নানা আশ্বাস, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কৌশলী কুশলবিনিময়ের মাধ্যমে তিনি নিজের এক নতুন ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখলাস উদ্দিন লিটনের এই হঠাৎ পরিবর্তন ও ‘ধান কুড়ানোর’ দৌড়ঝাঁপকে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেকে কোণঠাসা হওয়া থেকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে একপ্রকার সমঝোতা তৈরি করা এবং জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে মনে করছেন।

স্থানীয় ভোটারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
​লিটনের এই গতিপথ পরিবর্তন নিয়ে হাইজাদী ইউনিয়নের চায়ের কাপ থেকে শুরু করে হাটে-বাজারে চলছে জোর-সমালোচনা। তবে সচেতন ভোটার ও স্থানীয় বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় অনেকের মুখে কড়া সমালোচনা—”যারা গত এক দশক নৌকার পালে হাওয়া লাগিয়ে সুবিধা গুটিয়েছেন, তারা আজ ভোটের স্বার্থে ধান কুড়াতে আসছেন। এটা স্রেফ এক সুবিধাবাদী রাজনীতির চাতুর্য।

আড়াইহাজারের রাজনৈতিক আকাশে ক্ষমতার হাওয়ার সাথে রূপ বদলানো নেতার অভাব নেই। তবে “নৌকার মাঝি” থেকে “ধান কুড়ানি” হওয়ার এই নাটকীয় কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে হাইজাদী ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের বিচার-বুদ্ধির ওপর। ভোটাররা কি নতুন সাজের এই পুরনো প্রজাতিকে সাদরে গ্রহণ করবেন, নাকি ব্যালটের মাধ্যমে সঠিক জবাব দেবেন—তা দেখার জন্য সময়ের অপেক্ষায় পুরো হাইজাদীবাসী।

 

“আড়াইহাজার ভূমি অফিস যেন এক দুর্নীতির আখড়া”

নিজস্ব প্রতিবেদক, আড়াইহাজার।
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৪০ অপরাহ্ণ
“আড়াইহাজার ভূমি অফিস যেন এক দুর্নীতির আখড়া”

 

 

 

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা ভূমি অফিস দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেবাগ্রহীতাদের চরম হয়রানির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য এবং নানা দুর্নীতির অভিযোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষ নামজারি (মিউটেশন), খতিয়ান তোলা ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মতো অতিপ্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আড়াইহাজার ভূমি অফিসে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নামজারি বা অন্যান্য ভূমি সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের লেনদেন ছাড়া এই অফিসে কোনো ফাইল নড়াচড়া করে না। নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে নানা অজুহাতে আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয় কিংবা ফাইল বাতিল করে দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো- নামজারি বা খারিজের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি-এর বাইরে হাজার হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে মাসের পর মাস আবেদন আটকে রাখা হয়।

অফিস চত্বরে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। সরাসরি সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গেলে তাদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখিয়ে এই দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মাধ্যমেই ঘুষের লেনদেন ও দুর্নীতির বড় অংশ পরিচালিত হয়।

জমির কাগজপত্রে নাম সংশোধন বা রেকর্ড হালনাগাদ করার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকদের বাদ দিয়ে বা জটিলতা তৈরি করে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা সঠিক সময়ে অফিসে উপস্থিত না থাকা এবং সেবাপ্রার্থীদের সাথে অসদাচরণ করার মতো অভিযোগও প্রায়শই শোনা যায়।

ভূমি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ ও জনবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আড়াইহাজার ভূমি অফিসের একটি অংশের দুর্নীতির কারণে সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ জনগণ। ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই কার্যালয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। সেই সাথে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আড়াইহাজার ভূমি অফিসকে একটি হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ সেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

আইভী’র পর সাখাওয়াত লাঞ্ছিত: নেপথ্যে কারা?

শহর প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৯ অপরাহ্ণ
আইভী’র পর সাখাওয়াত লাঞ্ছিত: নেপথ্যে কারা?

 

 

বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত ও সড়ক শৃঙ্খলায় ফেরানোর প্রতিটি চেষ্টাই যেন এক অঘোষিত সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার স্মৃতি এখনো নগরবাসীর মনে তাজা। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের চিরচেনা চিত্র বিন্দুমাত্র বদলায়নি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নবনিযুক্ত প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ফুটপাত উচ্ছেদে গিয়ে হকারদের রোষানলে পড়ে লাঞ্ছনা ও হামলার চেষ্টার শিকার হয়েছেন।

আইভীর পর সাখাওয়াত—ব্যক্তি বদলালেও দৃশ্যপট অপরিবর্তিত থাকার পেছনে নেপথ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালী বলয়কেই দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু সড়ক ও শায়েস্তা খাঁ সড়কে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযানে যান নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও তার সঙ্গীয় কর্মীরা। উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতেই ক্ষুব্ধ হকাররা সংগঠিত হয়ে প্রশাসক ও তার কর্মীদের ঘিরে ধরে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে তারা উত্তেজিত হয়ে সাখাওয়াত হোসেনকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে এবং উচ্ছেদ কর্মীদের ওপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে হকাররা তাদের মালামাল রাস্তায় ফেলে বিক্ষোভ শুরু করে। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনাসূত্রে দেখা যায়, পুলিশের উপস্থিতি বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছাড়া আকস্মিক রাতের বেলা অভিযান চালানোয় এ অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার মহড়া ও সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ফুটপাত মুক্ত করার লক্ষ্যে চাষাঢ়ায় এলে তার ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়।

তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থক ও হকারদের যৌথ হামলায় সেদিন চাষাঢ়া চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মেয়র আইভীর ওপর নির্বিচারে গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, যেখানে মেয়রকে বাঁচাতে গিয়ে তার সমর্থক ও সাংবাদিকসহ অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। সেদিনের হামলাটি ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সরাসরি মদদে পরিচালিত, যা ক্ষমতার জোর দেখিয়ে শহরের অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার নগ্ন উদাহরণ।

দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে দুই জনপ্রতিনিধি/প্রশাসকের ওপর একই ধরনের হামলার ঘটনার পেছনের মূল কারণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়।

নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ও আশপাশের এলাকাগুলোতে শত শত হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলে একশ্রেণির প্রভাবশালী চক্র। সরকার বা প্রশাসনিক পরিবর্তন হলেও এই চাঁদাবাজ চক্রের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। ফলে হকার উচ্ছেদ হলে এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে যায়, যা সিন্ডিকেট কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না।

অতীত ও বর্তমান—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা ও কর্মসূচি পালনে এই বিশাল হকার সমাজকে ‘ভোট ব্যাংক’ ও ‘প্যাদা বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ এলেই হকারদের সামনে ঠেলে দিয়ে পেছনের সিন্ডিকেট ফায়দা লোটে।

আইভীর আমলে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা মেলেনি। আবার বর্তমান প্রশাসকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুলিশ প্রশাসনকে পর্যাপ্ত আগাম তথ্য না দিয়ে অভিযানে নামায় নিরাপত্তা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো দৃশ্যমান রোডম্যাপ তৈরি না করায় উচ্ছেদের পরপরই হকাররা অস্তিত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে এবং সহিংস রূপ নেয়।

নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত কেবল পথচারীদের চলাচলের রাস্তা নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াইয়ের ময়দানে। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী থেকে শুরু করে বর্তমান প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান—যারাই ফুটপাত মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তারাই এই অবৈধ চক্রের মুখোমুখি হয়েছেন। এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির রুট বন্ধ করতে না পারলে এবং পুলিশ-প্রশাসনের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ না থাকলে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত কখনোই সাধারণ মানুষের দখলে আসবে না।

 

“ইয়াবা সম্রাট’ আলামিন গাজী’র বহাল তবিয়তের নেপথ্যে কারা”?

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
“ইয়াবা সম্রাট’ আলামিন গাজী’র বহাল তবিয়তের নেপথ্যে কারা”?

 

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের এক অজোপাড়া গাঁয়ের সাধারণ যুবক মোঃ আলামিন গাজী। একসময় যার পরিচিতি ছিল অতি সাধারণ হিসেবে, তিনি আজ বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক। রাতারাতি আলামিনের এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে মাদকের আন্তর্জাতিক পাচার সিন্ডিকেট ও মানব পাচারের বিশাল সাম্রাজ্য। বিভিন্ন তথ্য ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার অপরাধ জগতের চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর নানা কৌশল।

আলামিন গাজীর আয়ের প্রধান উৎস হলো মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান দেশ ও বিদেশে পাচার করা। পাচারের জন্য তিনি বেছে নেন নিত্যনতুন ও অভিনব পন্থা। অনুসন্ধানের বের হয়ে আসে সাধারণ কোনো ব্যথানাশক বা অন্যান্য নিরাময়কারী ওষুধের মোড়ক কিনে এনে তার ভেতরে সুকৌশলে ইয়াবা ট্যাবলেট কাইটের মতো করে প্যাকেটজাত করা হয়।

গ্রামের দরিদ্র, বিদেশগামী কিংবা ঘুরতে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের বিমান টিকিট ও ঘোরাঘুরির খরচের প্রলোভন দেখানো হয়। তাদের দিয়ে ওষুধের প্যাকেটের কথা বলে এসব ইয়াবার চালান বিদেশে পাঠানো হয়। তাছাড়া দেশের বিমানবন্দরগুলোর অসৎ চক্রকে ম্যানেজ করার পাশাপাশি কখনো কখনো নদীপথে জাহাজের মাধ্যমেও মাদকের চালান নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো হয়।

​বেশ কিছুদিন আগে আলামিন গাজীর পাঠানো ৫ জন সহযোগী বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ সৌদি আরব পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সেখানকার কারাগারে বন্দি হন। ​তবে মূল হোতা আলামিন গাজী চতুরতার পরিচয় দেন। বিশাল অঙ্কের টাকা ছিটিয়ে ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজেকে এবং মূল সিন্ডিকেটকে রক্ষা করে কৌশলগতভাবে সৌদি আরব থেকে দেশে পালিয়ে আসেন। একজন সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক হয়েও দেশের বিমানবন্দরে অলৌকিক ভিআইপি সুবিধা পান তিনি, যা নিয়ে সচেতন মহলে চরম বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।

কেবল ইয়াবাতেই সীমাবদ্ধ নয় আলামিনের অপরাধের জাল। অনুসন্ধানে জানা গেছে ভালো চাকরির কথা বলে বা প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারীকে বিদেশে দেহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে পাচার করেছেন তিনি। অঢেল ও অবৈধ টাকার গরমে তিনি একাধিক বিবাহ করেছেন এবং বিলাস বহুল জীবনযাপন করছেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন, ঠিক তখন আলামিন গাজীর মতো অপরাধী কার ক্ষমতাবলে পার পাচ্ছেন—তা নিয়ে আড়াইহাজারজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও আলামিন গাজী প্রশাসনের একটি অসাধু অংশকে মাসোহারা ও সুবিধা দিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার মাদক সাম্রাজ্য চালিয়েছেন। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব ও ব্যবসা এখনো কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে, তা এক বড় প্রশ্ন।

পুলিশ, ডিবি, র‍্যাব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তাৎক্ষনিক হস্তক্ষেপে আলামিন গাজীকে আইনের আওতায় আনতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ অন্যান্য পয়েন্টে আলামিন গাজীকে যারা ‘ভিআইপি সেবা’ প্রদান করেছে এবং কার্গো/যাত্রী স্ক্যানিং এড়িয়ে মাদক পারাপারে সহায়তা করেছে, তাদের কল রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা।

সৌদিতে বন্দি থাকা ৫ তরুণের পরিচয়, তাদের পাসপোর্ট নম্বর এবং কার মাধ্যমে তারা টিকিট পেয়েছিলেন—সেই ব্যাংকিং ট্রানজেকশন ও টিকেট বুকিং এজেন্সির লিংক ধরে এগোলে আলামিনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে।

আড়াইহাজার বা ঢাকার স্থানীয় যেসব প্রেসিং বা প্যাকেজিং সোর্স থেকে ওষুধ কোম্পানির ভুয়া বা আসল মোড়ক সরবরাহ করা হয়, সেখানে অভিযান চালানো। কালাপাহাড়িয়া ও আড়াইহাজারের স্থানীয় কোন কোন বিকাশ/নগদ এজেন্ট বা হুন্ডি কারবারির মাধ্যমে আলামিনের মাদকের টাকা লেনদেন হয় এবং বিদেশে টাকা যায়, তা ট্র্যাক করা। আলামিন গাজী ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল এবং তিনি আয়কর ঠিকমতো দিচ্ছেন কিনা তার বিস্তারিত অডিট করা।

কালাপাহাড়িয়াসহ সমগ্র আড়াইহাজারের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে এই ‘ইয়াবা সম্রাট’ আলামিন গাজীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। নেপথ্যের সকল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মদদদাতাদের মুখোশ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি।

 

"নৌকার মাঝিও কুড়াতে চায় ধান" "আড়াইহাজার ভূমি অফিস যেন এক দুর্নীতির আখড়া" আইভী'র পর সাখাওয়াত লাঞ্ছিত: নেপথ্যে কারা? "ইয়াবা সম্রাট’ আলামিন গাজী'র বহাল তবিয়তের নেপথ্যে কারা"? "হকারদের দৌরাত্ম্যে অসহায় প্রশাসক সাখাওয়াত"