যুবদল নেতা জহির হত্যা: অভিযোগের তীর কেন মোবারক এর দিকে?
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে যুবদল নেতা জহির হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জহিরের মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি ও অপরাধের নানা গোপন বিষয় নতুন করে সামনে আসছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ, চরদখল ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই জহিরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আড়াইহাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক এক সাধারণ সম্পাদকের দিকে আঙ্গুল তুলেছে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে পরিচিত এই রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও নানা গুরুতর অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠছে।
নিহত জহিরের পরিবারের দাবি, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীতা সহ মেঘনা নদীর বালুমহল ও চরাঞ্চলের আধিপত্য নিয়ে বিরোধ চলছিল তার সঙ্গে। জহির এতে বাধা সৃষ্টি করায় তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, “জহিরকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘটনায় জড়িত মূল পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের মেঘনা নদীর বালুমহল নিয়ন্ত্রণ ও চরদখল ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং গ্রুপের তৎপরতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ওই সাবেক ছাত্রদল নেতা মোবারক হোসেন বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সাথে সখ্য বজায় রেখে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি চরাঞ্চলে নিজস্ব বলয় তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বাসভবনে অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে বলেও সূত্রে জানা গেছে। কোনো বৈধ ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও স্বল্প সময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া এবং এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
এলাকাবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চরদখল, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করে আসছেন মোবারক হোসেন। তাঁর প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, দলের সুনাম রক্ষা এবং কালাপাহাড়িয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকে ফেরাতে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা এলাকায় মোবারকের এই কায়েমী রাজত্ব ও সন্ত্রাস থেকে স্থায়ী মুক্তি চাই। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ করে যেন কেউ ছাড় না পায়, সে বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের কঠোর পদক্ষেপ ও হস্তক্ষেপ জরুরি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস বা নির্দিষ্ট ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক বনে গেছেন মোবারক। আওয়ামী লীগ আমলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে বালুমহল পরিচালনা, চরাঞ্চলে বালু উত্তোলন এবং অবৈধ চক্র পরিচালনার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ অর্জিত হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
নিহতের স্বজন ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের (দুদক/এনবিআর) মাধ্যমে মোবারকের আয়ের উৎস এবং বিপুল সম্পদের সঠিক অনুসন্ধান করা হোক। অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে যাতে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী লালন-পালন হতে না পারে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, “যুবদল নেতা জহির হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়েও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”


আপনার মতামত লিখুন