স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) রহস্যজনক নীরবতা ও ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ঝুট সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রমরমা সিন্ডিকেট। নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে শক্তিশালী কয়েকটি চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফতুল্লার ঝুট সেক্টর সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে রনি ও রাসেল সিন্ডিকেট। অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জের গার্মেন্টস ঝুট ব্যবসা কুক্ষিগত করে রেখেছে মানিক, শাহেদ ও সাগর সিন্ডিকেট। কোনো বৈধ ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাব ও টেন্ডারবাজিকে পেশা বানিয়ে এই চক্রগুলো প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অথচ এই বিশাল অঙ্কের অবৈধ উপার্জনের ভিড়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা রাজপথের ত্যাগী ও সাধারণ তৃণমূল কর্মীরা চরম অনাহার ও অবহেলায় দিন কাটাচ্ছেন।
কোনোরকম আইনি বাধা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ ছাড়াই যেভাবে এই ঝুট সাম্রাজ্য পরিচালিত হচ্ছে, তাতে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ জনগণের মাঝে। তৃণমূল কর্মী ও স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—ঝুট সন্ত্রাসীরা কি কোনো শক্তিশালী ‘অদৃশ্য ইশারা’য় চালিত হচ্ছে, নাকি সংসদ সদস্যরাও এই সিন্ডিকেট থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিচ্ছেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজপথের কর্মী অভিযোগ করেন, “আমরা দলের জন্য জীবন বাজি রেখে রাজপথে থাকি, আর নেতারা ঝুট দখল ও টেন্ডারবাজি করে বাড়ি-গাড়ির মালিক হচ্ছেন। এমপিদের এই নীরবতা কার্যত ঝুট সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর।”
কোনো বৈধ পেশা বা আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও ঝুট বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন এসব নেতারা। হাঁকাচ্ছেন বিলাসবহুল গাড়ি, গড়ে তুলেছেন অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঝুট খাত থেকে অর্জিত এই অবৈধ কালো টাকা ব্যবহার করে আসন্ন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও স্থানীয় যুবদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ হাতিয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা ও পাঁয়তারা চালাচ্ছেন এই ঝুট সম্রাটরা। অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে পদ দখল করে ঝুট সাম্রাজ্যকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার ছক কষছেন তারা।
শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও সাধারণ কর্মীদের ক্ষোভ থেকে রক্ষা পেতে হলে অবিলম্বে ঝুট সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত এসব চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও সাধারণ তৃণমূল কর্মীরা।
চতুর্মুখী রাজনৈতিক কৌতূহল, ক্ষোভ আর গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। যুবদল নেতা জহির হত্যা মামলায় চরম চাঞ্চল্য ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। ঘটনার পর পরই নিহতের স্বজন ও পরিবার থেকে সরাসরি মোবারকের নাম উত্থাপন করা হলেও, চূড়ান্তভাবে দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারে তার নাম উধাও হয়ে গেছে। কোনো এক ‘অদৃশ্য ইশারায়’ এজাহার থেকে মোবারকের নাম বাদ পড়ায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মী এবং সচেতন মহলের মাঝে।
জহির হত্যার পর স্বজনদের কান্না ও উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগে যার নাম সবচেয়ে জোরেসোরে উচ্চারিত হয়েছিল, সেই মোবারক কীভাবে মামলার প্রাথমিক আসামির তালিকা থেকেও বাদ পড়লেন—তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। দলীয় তৃণমূল কর্মী ও স্থানীয়দের মাঝে এখন বড় প্রশ্ন—দূর থেকে বসে এ নাটকের সুতা টানছেন কে? কার নির্দেশে এবং কিসের বিনিময়ে এ হত্যাকাণ্ড থেকে প্রধান অভিযুক্তকে ‘অব্যাহতি’ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলো?
ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তৃণমূলের কর্মীদের দাবি, কোনো প্রকার বৈধ ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও মোবারকের মতো ব্যক্তিরা কীভাবে সবসময় পার পেয়ে যান? আসলে তার ‘খুঁটির জোর’ কোথায়? কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কোনো প্রভাবশালী মহল বা সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাতের ফলেই মূল আসামিকে আড়াল করে মামলা হালকা করার পাঁয়তারা চলছে।
পরিবারের প্রাথমিক অভিযোগের পরও এজাহারে নাম না থাকায় বিচার পাওয়া নিয়ে মারাত্মক সংশয় প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। অবিলম্বে নেপথ্যের কলকাঠি নাড়ানো মূল খলনায়কদের মুখোশ উন্মোচন এবং মোবারকসহ জহির হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের হাজিরটেক গ্রামের বাসিন্দা মো. আলামিন গাজী (পিতা: হাজির আলী) অল্প সময়ে বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। সাধারণ কাজের ভিসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য গমনকারী একজন ব্যক্তির এত দ্রুত অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে এলাকায় নানান গুঞ্জন ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র বলছে, আলামিন গাজী সাধারণ শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে মাসে আনুমানিক ১,৫০০ রিয়াল বেতনে কর্মরত ছিলেন। তবে বিগত ২ থেকে আড়াই বছরের মধ্যে তাঁর আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক ও আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে।
জানাগেছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অর্থ উপার্জনের নেপথ্যে মানবপাচার ও বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে লিখিত আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন আলামিন গাজী। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদি সুলতানের মোড় এলাকায় ৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৬ তলা ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে জমি ও ফ্ল্যাটের তথ্য উঠে এসেছে।
সম্পদের ধারাবাহিক প্রসারের অংশ হিসেবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘সীমান্ত টাওয়ার’-এ অত্যন্ত চোখধাঁধানো ও বড় পরিসরে একটি আধুনিক জুতার শো-রুম উদ্বোধন করেছেন তিনি। আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া থেকে এসে জেলা শহরের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক ভবনে এতো বড় শো-রুম চালুর ঘটনা স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও বেশ আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ও পুরো আড়াইহাজারের সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দিকে। অভিযুক্ত আলামিন গাজীর আয়ের প্রকৃত উৎস এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা অনুসন্ধানে দুদক কী পদক্ষেপ নেয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্ক, বলয় তৈরি, অন্তর্কোন্দল এবং আসন্ন আইনজীবী সমিতি ও ফোরামের পদ-পদবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি। বিএনপিপন্থী আইনজীবী মহলে আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব জাহির করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নতুন নতুন সমীকরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হাতাহাতির ঘটনায় এখন সরগরম পুরো কোর্টপাড়া। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং শীর্ষ আইনজীবীদের ভূমিকা নিয়ে রূপ নিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অগ্রযাত্রায় সাবেক স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট খোরশেদ মোল্লার অবদান অনস্বীকার্য। বিগত কঠিন সময়ে রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম থেকে শুরু করে আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুঃসময়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ আইনজীবীদের আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে তাঁর সাহসী ভূমিকা আদালতপাড়ার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে আদালতপাড়ার প্রধান চালিকাশক্তি। বিভিন্ন আন্দোলন ও আইনজীবী সমিতি পরিচালনায় তাঁর একক প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অনুসারী ও সাবেক অনুসারীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় তাঁর রাজনীতির ছকে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। কোর্টপাড়ায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আগামী দিনের রাজনীতিতে নিজের বলয় শক্তিশালী করতে তিনি নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন।
বর্তমান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের উত্থান নারায়ণগঞ্জ কোর্টপাড়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সাখাওয়াত হোসেন খানের হাত ধরে মূলধারার রাজনীতির রাজনীতিতে এলেও বর্তমানে তিনি সাখাওয়াত বিরোধী শিবিরের শীর্ষভাগে অবস্থান করছেন। প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বৃহৎ অংশের আইনজীবীদের সমর্থন তাকে এক শক্ত ভিত্তি এনে দিলেও, আগামী দিনে ফোরামের রাজনীতি ও আদালতপাড়ার দ্বন্দ্বে নিজের এই শক্ত অবস্থান বজায় রাখাটাই তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ।
আইনজীবী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এইচ এম আনোয়ার প্রধান আদালতপাড়ায় এখন বেশ শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক ‘গুরু’ সাখাওয়াত হোসেন খানের সাথে চরম দূরত্ব তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ‘সভাপতি’ পদপ্রার্থী হওয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাখাওয়াত বিরোধী বলয়ের সমর্থন ও নিজস্ব জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান কোন উচ্চতায় পৌঁছায়, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর।
আদালতপাড়ার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও আইনজীবী সমাজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়ন এবং অ্যাডভোকেট রিফাতের ভূমিকা ও অবদান চোখে পড়ার মতো। সাধারণ আইনজীবীদের বিভিন্ন সংকটে পাশে থাকা ও পেশাগত অধিকার রক্ষায় তাদের সরব উপস্থিতি আইনজীবী অঙ্গনকে সব সময় চাঙ্গা রেখেছে। সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সক্রিয়তা অব্যাহত রেখেছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার সিনিয়র ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট বারী ভূইয়া অতীত থেকেই আদালত অঙ্গনের প্রতিটি সংকট নিরসনে মধ্যপন্থী, অভিভাবকতুল্য ও গঠনমূলক অবদান রেখে আসছেন। তবে সাম্প্রতিককালে আদালতপাড়ার উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট ও হাতাহাতির ঘটনার সমাধানের লক্ষ্যে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানালেও তাতে কেউ সাড়া দেননি। প্রবীণ এই আইনজীবীর আহ্বানে কারো কর্ণপাত না করা এবং একপ্রকার ‘মূল্যহীন’ মনে করে এড়িয়ে চলার বিষয়টি আদালতপাড়ার শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রবীণ আইনজীবীদের তীব্রভাবে ব্যথিত করেছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ও আদালতপাড়ার অভ্যন্তরীণ বলয় তৈরিতে অ্যাডভোকেট আজিজ মোল্লা, গালিব এবং জাকিরের সক্রিয়তা এখন বেশ দৃশ্যমান। সাখাওয়াত ও আনোয়ার-জাকির বলয়ের টানাটানির মাঝে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ আইনজীবী সমিতি ও ফোরামের নেতৃত্বে মাঝারি ও তরুণ সারির এই উদীয়মান নেতারা নিজেদের কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কার পাল্লা ভারী করেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী হিসাব-নিকাশ।
এদিকে সম্প্রতি আদালতপাড়ায় গুঞ্জন ছড়ায় যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি সুমন নিজের পদ ও প্রভাব বজায় রাখার তাগিদে অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধানকে ‘ম্যানেজ’ করার এক গোপন উদ্যোগে নেমেছেন। খবর চাউর হয়েছে, এই জটিল পরিস্থিতি সমাধান এবং সমঝোতা ও ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় নেপথ্য কারিগর হিসেবে মধ্যস্থতা করছেন রাসেল প্রধান। এই সমঝোতার খবরের গুঞ্জন চাউর হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনজীবী মহলে নতুন আলোচনা ও কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের আগামী দিনের নেতৃত্বের দৌড়ে কারা আসছেন—তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। কোর্টপাড়ার সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং বলয়ভিত্তিক সমঝোতার প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের শীর্ষ পদে অ্যাডভোকেট খোরশেদ মোল্লা (সাবেক স্পেশাল পিপি) এবং বর্তমান পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের আসার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফোরামের নেতৃত্ব এই দুই নেতার হাতে গেলে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি নতুন রূপ পাবে এবং শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে বলেই মনে করছেন সাধারণ আইনজীবীরা।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, পিপি পদ নিয়ে বিতর্ক এবং আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতিতে যদি শেষ পর্যন্ত আনোয়ার প্রধান (সভাপতি) ও জাকির হোসেন (সাধারণ সম্পাদক) পদে সমিতিতে চলে আসেন এবং সুমনের চেয়ার সুরক্ষিত হয়, তবে সাখাওয়াত হোসেন খান এবং তাঁর সাথে থাকা আজিজ মোল্লা ও গালিবদের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে কোর্টপাড়ার রাজনীতি নিয়ে একাধিক বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত জাকির হোসেন সাধারণ সম্পাদক হন এবং আনোয়ার প্রধান সভাপতি পদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন, তবে এটা স্পষ্ট হবে যে—সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুসারী আজিজ মোল্লা ও গালিবদের মতো রাজপথ ও বারের সক্রিয় মাঠপর্যায়ের নেতাদের মূলত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সাখাওয়াত বলয়ের এই নেতাদের ত্যাগ কেবল ‘কুরবানি’ বা রাজনৈতিক গুটি হিসেবেই গণ্য হবে। রাজনৈতিক শিষ্যের (আনোয়ার প্রধান) কাছে নিজের আধিপত্য হারানো এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পদে নিজের পছন্দের পূর্ণ বলয় বসাতে না পারা সাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে মারাত্মক ধাক্কা দেবে।
স্পেশাল পিপি সুমনের নিয়োগ ঠেকানো এবং সাবেক স্পেশাল পিপি খোরশেদ মোল্লার অধিকার বা বারের স্বার্থ রক্ষার নাম করে যে বিরোধ ও লড়াই শুরু হয়েছিল, সুমন চেয়ারে বসে গেলে সেই পুরো আন্দোলনের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা শূন্যে মিলিয়ে যাবে। সুমনকে ম্যানেজ করার বা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে যদি সমঝোতা হয়, তবে এতে আনোয়ার প্রধান রাজনৈতিকভাবে আরও একধাপ এগিয়ে যাবেন। প্রমাণিত হবে যে, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আনোয়ার প্রধান যা চেয়েছেন, সেটাই বাস্তবায়িত হয়েছে।
সমিতির নির্বাচনে যদি আনোয়ার প্রধান সভাপতি এবং জাকির হোসেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নারায়ণগঞ্জ কোর্টপাড়ায় সাখাওয়াত হোসেন খানের দীর্ঘদিনের একক প্রভাবের সমাপ্তি ঘটবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে “আনোয়ার-জাকির” যুগের সূচনা হবে। একদিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে বার সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা জাকির হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার শীর্ষে নিয়ে যাবে। এতদিন ধরে যে সাধারণ আইনজীবীরা সাখাওয়াতের ডাকে রাজনৈতিক সংঘাত ও সমঝোতাবিরোধী অবস্থানে শামিল হয়েছিলেন, তারা নিজেদের চরম প্রতারিত মনে করবেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, যদি এত দ্বন্দ্ব, হট্টগোল এবং রক্তচাপ বাড়ার পর শেষ পর্যন্ত সুমন স্পেশাল পিপি হিসেবে স্থায়িত্ব পান এবং সমিতির নির্বাচনে আনোয়ার প্রধান ও জাকির হোসেন মনোনীত হয়ে বার শাসন করেন—তবে মাঠের লড়াইয়ে নামা আজিজ মোল্লা ও গালিবদের অবস্থান হবে রাজনৈতিকভাবে ‘বলির পাঁঠা’ হওয়ার শামিল। এটি সাখাওয়াত হোসেন খানের মাস্টারপ্ল্যানের চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং আদালতপাড়ার রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে আনোয়ার-জাকির বলয়ের হাতে।
আপনার মতামত লিখুন