যাত্রী ছাউনি ও সড়ক দখল
বন্দর ঘাটে অর্ধকোটির ‘চাঁদাবাজি’ নেপথ্যে প্রভাবশালী!
নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ বন্দর ১নং সেন্ট্রাল খেয়াঘাট স্ট্যান্ডে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা করলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে চাঁদাবাজির মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে। বিগত সরকারের দোসররা পালিয়ে যাওয়ার পর পুরো ঘাটের নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে বিএনপি পরিচয়ধারী একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে। সিটি কর্পোরেশনের টোল আদায় বন্ধ থাকলেও এই চক্রটি দৈনিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে প্রায় অর্ধকোটি টাকার অবৈধ চাঁদাবাজি মেলাচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দর খেয়াঘাটের যাত্রী ছাউনি অবৈধভাবে দখল করে বসানো হয়েছে দোকানপাট। বেবিস্ট্যান্ডের একপাশে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই দোকানগুলো থেকে দৈনিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ যাত্রীরা বলেন, “বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ রক্ত দিল, প্রাণ দিল। অথচ বন্দর খেয়াঘাটের যাত্রী ছাউনিতে যাত্রীরা বসার জায়গা পায় না। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ে দোকান বসিয়ে জনভোগান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাহলে দিনশেষে কী পরিবর্তন হলো? আমরা এই চাঁদাবাজদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরপরই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বন্দর বেবিস্ট্যান্ড ও সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি এবং ছাত্রলীগ নেতা খান মাসুদ। এরপরই স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
স্থানীয়রা জানান, চলতি বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) থেকে সিএনজি স্ট্যান্ডের টেন্ডার দেওয়া হলেও পরবর্তীতে নাসিক প্রশাসক তা বন্ধ করে দেন। কিন্তু প্রশাসনের সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যুবদলের কতিপয় নেতা ও এত পাভাবশালি ভাইজানের নাম ভাঙিয়ে তাদের নিযুক্ত লোক দিয়ে প্রতিদিন প্রতিটি ইজিবাইক, মিশুক ও অটো রিকশা থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
ঘাটে চলাচলকারী একজন ইজিবাইক চালক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের এখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি অটো চলে। ঘাটের সামনে আসলেই ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। তারা এখানকার স্থায়ী লোক, টাকা না দিলে গাড়ি রাখতে দেয় না এবং মারধর করে।”
অনুরূপ অভিযোগ করেন এক মিশুক চালকও। তিনি জানান, “বন্দর বাজারের সামনে টোকেনের মাধ্যমে প্রতিদিন ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। সড়কে গাড়ি চালাতে হলে এই টাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। টাকা দিতে দেরি হলে বা না দিলে মারধর করা হয়, এমনকি গাড়ির চাকাও ফুটো করে দেওয়া হয়।”
অনুসন্ধানে বন্দর খেয়াঘাট এলাকার চাঁদাবাজির যে হিসাব মিলেছে তা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। ব্যাটারিচালিত অটো প্রায় ৩০০টি অটো থেকে দৈনিক ২০ টাকা হারে প্রতিদিন ৬,০০০ টাকা তোলা হয়। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা।
মিশুক স্ট্যান্ড প্রতিদিন মিশুক গাড়ি থেকে প্রায় ৮,০০০ টাকা চাঁদা ওঠে। বছর শেষে যার পরিমাণ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। অবৈধ দোকানপাট যাত্রী ছাউনি ও ঘাটের সড়ক দখল করে থাকা প্রায় দেড় শতাধিক দোকান থেকে ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ দৈনিক প্রায় ২৫,০০০ টাকা তোলা হয়। সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে বছরে আরও প্রায় ২০ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয়।
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা যাচ্ছে বিএনপি পরিচয়দানকারী এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের পকেটে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জনমনে। সম্প্রতি বন্দর ঘাট এলাকায় চাঁদাবাজি করার সময় ‘সোহাগ’ নামে এক চাঁদাবাজকে হাতেনাতে আটক করে বন্দর থানা পুলিশ। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হলেও মূল হোতারা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। মূল সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। এই বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ বাণিজ্য ও জনদুর্ভোগের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় সাধারণ জনগণ।


আপনার মতামত লিখুন