“তিন হেভিওয়েটের সমীকরণ, নাকি অন্য কেউ”?
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে (নাসিক) ঘিরে রাজনীতিতে এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর পরিবর্তনের হাওয়ায় নগরবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন—কে হচ্ছেন প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত এই নগরের আগামী দিনের অভিভাবক বা ‘নগর পিতা’? এই আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে তিন প্রভাবশালী মুখ। বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ (মডেল মাসুদ) এবং এমপি নজরুল ইসলাম আজাদের ভাই ব্যবসায়ী রাকিবুর রহমান রাকিব।তবে আপাতদৃষ্টিতে দৌড়ে থাকা এই তিন মুখের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় নানা জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ‘সাত খুন’ মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াই চালিয়ে প্রথম সারা দেশে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব দেওয়া সাখাওয়াত মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব লাভ করেন এবং ২০১৬ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে তিনি নাসিক-এর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। তবে চেয়ারে বসার পর থেকেই ফুটপাত উচ্ছেদ, হকারদের ক্ষোভ ও স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামলাতে গিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি আদালত চত্বরের অনভিপ্রেত ঘটনা ও উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিতর্ক তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ইমেজ সংকট তৈরি করেছে। দলীয় হাইকম্যান্ড শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক কাটিয়ে তার ওপর আস্থা রাখবে, নাকি নতুন বিকল্প খুঁজবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে ‘ডিয়ার মোস্তফা ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। ‘মেইড ইন নারায়ণগঞ্জ’ স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি নগর রাজনীতিতে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিগত দিনে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ও বিগত সরকারের অনুগ্রহ পাওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তৃণমূল রাজনীতিতে বা বিএনপির দলীয় কোনো সাংগঠনিক পদ-পদবী তার নেই। ফলে জনসেবা ও ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে ভোটার ও কেন্দ্রের আস্থা কতটা অর্জন করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও এমপি নজরুল ইসলাম আজাদের ছোট ভাই রাকিব এর মূল পরিচয় ব্যবসায়ী। তবে বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘মোস্তাফিজুর রহমান ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তামূলক কাজ করে তিনি এক ধরনের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। মডেল মাসুদের মতো রাকিবেরও বিএনপি দলীয় কোনো পদ- পদবী নেই। তার চেয়ে বড় বিষয়, তিনি আদৌ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকার নিবন্ধিত ভোটার কি না—তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নিজস্ব ভোটার পরিচয় এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে সরাসরি দলীয় সমর্থন ছাড়া মেয়রের মতো বড় পদে শক্ত অবস্থান নেওয়া সহজ নয়।
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের আইনি ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও সাময়িক ইমেজ সংকট তার বড় বাধা। অন্যদিকে মডেল মাসুদ ও রাকিবের আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব থাকলেও দলীয় পদবী এবং সরাসরি রাজনৈতিক কাঠামোর অভাব তাদের পিছিয়ে রাখছে।নারায়ণগঞ্জ সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ময়দানে দলীয় প্রতীক, স্থানীয় ভোটারদের সরাসরি সমর্থন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিই চূড়ান্ত নিয়ামক। এই তিন হেভিওয়েটের নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা কি শেষ মুহূর্তে কোনো ‘বিতর্কহীন ও সর্বজনগ্রাহ্য’ নতুন মুখ এনে চমক দেবেন, নাকি এই তিনের মধ্য থেকেই কাউকে বেছে নেবেন—তা দেখতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নগরবাসীকে।


আপনার মতামত লিখুন