বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রমরমা ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার বাস্তবতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন নারায়ণগঞ্জের এক শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের ব্যর্থতা, পদে পদে ঘুষ ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার নামে চলা হরিলুটের কড়া সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এসব দুর্নীতি বন্ধ হলে দেশের পোশাক শ্রমিকদের বেতন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় উন্নীত করলেও কোনো মালিকের লোকসান হবে না।
সম্প্রতি দেশের এই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের ভেতরের চিত্র তুলে ধরে এক চাঞ্চল্যকর ও সাহসী বক্তব্য দেন। যা নিয়ে ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের মাঝেও তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
যেখানে খরচ হয় উপার্জনের বড় অংশ
ব্যবসায়ী নেতার দাবি অনুযায়ী, দেশের পোশাক কারখানাগুলো পদে পদে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির শিকার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স, কাগজপত্রের নবায়ন ও ছাড়পত্র নিতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ঘাম ঝরাতে হয়। কিন্তু সবচেয়ে লজ্জাজনক হলো— দাপ্তরিক ফি বা সরকারের নির্ধারিত রাজস্বের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, বিশেষ দিন, জন্মবার্ষিকী কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীর চাঁদা হিসেবে প্রভাবশালী মহলের পকেটে চলে যায় মোটা অঙ্কের টাকা।
তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, কারখানা সচল রাখতে গিয়ে মালিকপক্ষকে যে অনুৎপাদনশীল ও অবৈধ খরচ বহন করতে হয়, তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ শ্রমিকদের বেতনের ওপর।
সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করেন, পোশাক খাতের শ্রমিকরা কম বেতন পাওয়ার পেছনে বোধহয় কেবল মালিকপক্ষের লোভ বা নিষ্ঠুরতা দায়ী। কিন্তু এই ব্যবসায়ী ভিন্ন এক সত্য সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, যারা পোশাক শ্রমিকদের কম বেতনে কাজ করতে দেখে বা তাদের পেশাকে অবমূল্যায়ন করে ঘৃণা প্রকাশ করেন, তারা হয়তো জানেন না যে— এই ঘুষ ও চাঁদাবাজির অবৈধ টাকা শেষ পর্যন্ত সেই সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিবাজদের পকেটেই যায়, যারা পরোক্ষভাবে এই শোষণ টিকিয়ে রেখেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পোশাক শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতাসক্ষম করতে এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ (এক ছাদের নিচে সব সেবা) চালুর কথা বলে আসছে সরকারগুলো। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সরকারের আমলেই এই সেবা দিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হওয়ায় দেশের রপ্তানি খাত আজ এক ধরনের জিম্মি দশায় পড়েছে।
বিদেশের মাটিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, উন্নত বা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে ব্যবসায়ীদের অযথা ঘুষ বা চাঁদা দিতে হয় না। ফলে তারা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য ও ন্যায্য মুনাফা যেমন পায়, তেমনি শ্রমিকদেরও আকর্ষণীয় ও জীবনোপযোগী মজুরি দিতে সক্ষম হয়।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে মর্মান্তিক যে দিকটি উঠে এসেছে, তা হলো ন্যায্য বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের রাজপথে নেমে আসার করুণ পরিণতি। একদিকে সিন্ডিকেটের কারণে কলকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাঙ্ক্ষিত বেতন বাড়াতে পারে না। আর এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা যখন রাস্তায় নামেন, তখন তাদের বুলেট ও লাঠিপেটার মুখোমুখি হতে হয়। বহু শ্রমিককে রাজপথে রক্ত দিতে হয়, এমনকি লাশ হয়ে ফিরতে হয় নিজ ঘরে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের এই ব্যবসায়ীর বক্তব্য কেবল কোনো একক কারখানার চিত্র নয়; এটি গোটা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের এক নির্মম দর্পণ। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি এখনই কঠোর হাতে ঘুষ, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট দমন করে সত্যিকার অর্থে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে এই খাতের মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ । ১:২৬ অপরাহ্ণ