“শেখ হাসিনা পতনের পরও আড়াইহাজার সাব- রেজিষ্ট্রী অফিসে সিন্ডিকেট দৌরাত্ম “

নিজস্ব প্রতিবেদক, আড়াইহাজার।
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ

 

 

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলেও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার সাব-রেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিসের চিত্র বদলায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ঘুষমুক্ত সেবার আশা করলেও, আড়াইহাজারে বহাল রয়েছে পুরোনো দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। কার্যালয়ের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মদদে অসাধু কর্মচারী ও স্থানীয় দালাল চক্র কৃত্রিম ভোগান্তি সৃষ্টি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

১২ মার্চ ২০২৫ উপজেলার গোপালদী এলাকার সেবাগ্রহীতা সফিকুল ইসলাম তার পৈতৃক জমির নামজারির (মিউটেশন) আবেদন নিয়ে অফিসে যান। নথিপত্র সম্পূর্ণ বৈধ থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিস সহকারী ও কপিরক্ষক তার ফাইলে খাস জমির ভুয়া অজুহাত তুলে ফাইল আটকে দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় এক প্রভাবশালী মহুরির মাধ্যমে ২৫,০০০ টাকা ঘুষ হস্তান্তরের পর দিনই ফাইল স্বাক্ষর হয়ে যায়।
​১৮ আগস্ট ২০২৫ কাউন্দিয়া এলাকার একটি প্রবাসীদের জমিতে ভুয়া আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) তৈরির চেষ্টার সময় ভুক্তভোগী পরিবার সরাসরি বাধা দিতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারীদের সহায়তায় উল্টো হয়রানির শিকার হয়। সরকারি রেজিস্টার খাতায় তথ্য গোপনের উদ্দেশ্যে ফাইল প্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়ার বিনিময়ে জালিয়াতি চক্রকে সহায়তা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে অফিসের পেছনের সারির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।

১০ জানুয়ারি ২০২৬ পৌরসভা এলাকার বাণিজ্যিক শ্রেণির জমিকে ‘ডোবা’ বা ‘কৃষি’ জমি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, যার একটি বড় অংশ কার্যালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও দালাল সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। প্রতিবাদ জানাতে গেলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ফাইল ঝুলিয়ে রাখা বা রেজিস্ট্রি না করার হুমকি দেওয়া হয়।
​২২ এপ্রিল ২০২৬ সাদিপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আতাউর রহমান তার কেনা জমির দলিল রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে শিকার হন চরম ভোগান্তির। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন অফিস সহকারী ও দলিল লেখক সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য কাজল ঢালী এবং মহিতুল ইসলাম হিরুর মাধ্যমে অতিরিক্ত ১২,০০০ টাকা না দেওয়ায় তার রেজিস্টির ফাইলটি টানা এক মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহুরির মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করার পর তার দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়।

অতীতে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার ইছহাক আলী মণ্ডলের টেবিলে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল হওয়া, কিংবা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভুক্তভোগী রমজান আলীর দায়ের করা চিঠির ভিত্তিতে সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক কাজল ঢালী ও মহিতুল ইসলাম হিরুর বিরুদ্ধে দুদকে আর্থিক দুর্নীতির যে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল—তার কোনো দৃশ্যমান সমাধান আজও হয়নি। বর্তমানে কার্যালয়ের টিসি বা উমেদারদের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে টাকা লেনদেনের একই পুরাতন মডেল চালু রাখা হয়েছে।

দলিল নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রি) ক্ষেত্রে সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও ফাইলপ্রতি ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত “সিরিয়াল ফি” ও উমেদার খরচ হিসেবে দিতে হয়। সরকারি রেট চার্ট টাঙানো থাকলেও তা কেবল খাতাপত্রেই সীমাবদ্ধ। কার্যালয়টিতে স্থানীয় প্রভাবশালী দলিল লেখক (মহুরি) ও উমেদারদের সমন্বয়ে শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সাধারণ সেবাগ্রহীতা সরাসরি কোনো সেবা নিতে গেলে বা প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। সিন্ডিকেটের হাত না ধরে সরাসরি ফাইল জমা দিলে নানা অজুহাতে তা বাতিল বা আটকে দেওয়া হয়।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সরকারি খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে অবৈধভাবে রেজিস্ট্রি ও খতিয়ান প্রস্তুতের পাঁয়তারা চালাচ্ছে চক্রটি। বিগত সরকারের আমল থেকে চলে আসা এই চর্চা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও বন্ধ হয়নি।

উপজেলার স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমরা ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে, ৫ আগস্টের পর ভূমি অফিসে ঘুষ দেওয়া লাগবে না। কিন্তু অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখগুলো পাল্টালেও সিন্ডিকেটের নিয়ম একই রয়ে গেছে। ফাইল প্রতি নির্ধারিত চাঁদা না দিলে কাজই এগোয় না।”

এ বিষয়ে সচেতন মহল মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল ভাবনাই ছিল দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়া। অথচ আড়াইহাজার ভূমি ও রেজিস্ট্রি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এখনো কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় দুর্নীতি চালু থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

 

প্রকাশক ও সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল মামুন । বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃশিমুলতলীর বাজার,হাইজাদী, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ। মোবাইলঃ 01923708085, ইমেইল : alm97384@gmail.com, ওয়েব সাইট : www.deshbani24.com

প্রিন্ট করুন