শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পোশাক কারখানার কোটি কোটি টাকার ‘ঝুট ব্যবসা’ এখন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের শঙ্কা ও বাসিন্দাদের কাছে আতঙ্কের অপর নাম। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে একের পর এক আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রের মহড়া ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা গেলেও এই লাভজনক খাতের নৈরাজ্যের কোনো অবসান ঘটেনি; বরং বদলেছে শুধু নিয়ন্ত্রকদের নাম ও হাত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফতুল্লার বিশাল এই ঝুট সেক্টর বর্তমানে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটু, স্থানীয় প্রভাবশালী রিয়াদ চৌধুরী এবং রাসেল সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে বন্দি হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সরকার পরিবর্তনের পরপরই বিসিক শিল্পনগরী ও ফতুল্লার বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট নামানো কেন্দ্র করে তৈরি হয় নতুন বলয়। এর নেপথ্যে মূল কলকাঠি নাড়ছেন মশিউর রহমান রনি ও শহীদুল ইসলাম টিটুর মতো উচ্চপর্যায়ের স্থানীয় নেতারা। যদিও তারা প্রকাশ্যে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন, বাস্তবে তাদের অনুসারী ও অনুগত ক্যাডার বাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাঠপর্যায়ে স্পট ও গার্মেন্টস দখলের মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ চৌধুরী ও রাসেল সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে ফতুল্লার ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণে আরও বেশ কিছু নাম সামনে এসেছে। রনি ও টিটু বলয়ের সহযোগী হয়ে মাঠে সরাসরি সক্রিয় রয়েছে— এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব খাইরুল আলম জসিম ও যুবদল কর্মী অভি। মাসুদুর রহমান এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্রধারী গ্রুপ। স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচিত হিসাম, সুজন এবং অপু, যারা কারখানায় অস্ত্র প্রদর্শন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজ পরিচালনা করে।
জানাগেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিকেলেই ফতুল্লা বিসিক ও সংলগ্ন কারখানাগুলোর পূর্বের নিয়ন্ত্রণকারীদের তাড়িয়ে রাতারাতি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালায় নতুন রাজনৈতিক বলয় ও স্থানীয় ক্যাডাররা।
২৮ আগস্ট ২০২৪ বিসিক শিল্পনগরীর একটি পোশাক কারখানার ঝুট নামানো কেন্দ্র করে রিয়াদ চৌধুরী ও রাসেল পক্ষের সঙ্গে অন্য একটি স্থানীয় গ্রুপের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে, যা পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ঝুটের কাজ না পেয়ে একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় জসিম ও অভি গ্রুপের ক্যাডাররা।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ বিসিকের ১ নম্বর গলি ও চাঁদনী হাউজিং এলাকায় ঝুটের স্পট দখল নিয়ে মশিউর রহমান রনি ও শহীদুল ইসলাম টিটুর অনুসারী গ্রুপের মধ্যে মুখোমুখি তীব্র সংঘর্ষ হয়। এ সময় প্রকাশ্যে অন্তত ১০-১২ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় এবং একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে এক পথচারী ও এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়।
৩ অক্টোবর ২০২৪ এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব খাইরুল আলম জসিম ও অভি গ্রুপের ক্যাডাররা একটি কারখানার সামনে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে অন্য ব্যবসায়ীদের তাড়িয়ে দেয় এবং ঝুট বোঝাই একটি ট্রাক আটকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা দাবি করে।
১২ অক্টোবর ২০২৪ বারবার ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনায় বিসিক এলাকায় যৌথবাহিনী ও পুলিশ চিরুনি অভিযান চালায়। এ সময় মাসুদুর রহমান, হিসাম ও সুজন গ্রুপের ৩ জন সক্রিয় ক্যাডারকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
২৪ অক্টোবর ২০২৪ যৌথবাহিনীর অভিযানের কিছুদিন যেতে না যেতেই ফতুল্লার কুতুবপুর ও বিসিক এলাকায় পুনরায় রনি ও টিটু সমর্থকদের একচ্ছত্র আধিপত্য জানান দিয়ে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে শো-ডাউন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় সশস্ত্র ক্যাডাররা।
ফতুল্লার তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরা সরাসরি এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। ন্যায্যমূল্যে কোনো নিরপেক্ষ ব্যবসায়ীর কাছে ঝুট বিক্রি করার সুযোগ নেই। বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে জোরপূর্বক ঝুট নামিয়ে নেয় এই চক্রটি। বাধা দিলে কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া বা পণ্যবাহী গাড়ি ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও মহড়ার পর যৌথবাহিনী ও পুলিশ একাধিক অভিযান চালিয়ে সাময়িক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও এবং কিছু নিম্নস্তরের ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের স্পষ্ট দাবি, শুধু মাঠপর্যায়ের দু-একজনকে গ্রেপ্তার না করে মূল মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে ফতুল্লার এই নৈরাজ্য ও ঝুট সন্ত্রাস স্থায়ীভাবে থামবে না।

ফতুল্লা প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ । ৩:২৬ অপরাহ্ণ