সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্ক, বলয় তৈরি, অন্তর্কোন্দল এবং আসন্ন আইনজীবী সমিতি ও ফোরামের পদ-পদবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি। বিএনপিপন্থী আইনজীবী মহলে আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব জাহির করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নতুন নতুন সমীকরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হাতাহাতির ঘটনায় এখন সরগরম পুরো কোর্টপাড়া। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং শীর্ষ আইনজীবীদের ভূমিকা নিয়ে রূপ নিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অগ্রযাত্রায় সাবেক স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট খোরশেদ মোল্লার অবদান অনস্বীকার্য। বিগত কঠিন সময়ে রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম থেকে শুরু করে আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুঃসময়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ আইনজীবীদের আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে তাঁর সাহসী ভূমিকা আদালতপাড়ার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে আদালতপাড়ার প্রধান চালিকাশক্তি। বিভিন্ন আন্দোলন ও আইনজীবী সমিতি পরিচালনায় তাঁর একক প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অনুসারী ও সাবেক অনুসারীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় তাঁর রাজনীতির ছকে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। কোর্টপাড়ায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আগামী দিনের রাজনীতিতে নিজের বলয় শক্তিশালী করতে তিনি নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন।
বর্তমান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের উত্থান নারায়ণগঞ্জ কোর্টপাড়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সাখাওয়াত হোসেন খানের হাত ধরে মূলধারার রাজনীতির রাজনীতিতে এলেও বর্তমানে তিনি সাখাওয়াত বিরোধী শিবিরের শীর্ষভাগে অবস্থান করছেন। প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বৃহৎ অংশের আইনজীবীদের সমর্থন তাকে এক শক্ত ভিত্তি এনে দিলেও, আগামী দিনে ফোরামের রাজনীতি ও আদালতপাড়ার দ্বন্দ্বে নিজের এই শক্ত অবস্থান বজায় রাখাটাই তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ।
আইনজীবী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এইচ এম আনোয়ার প্রধান আদালতপাড়ায় এখন বেশ শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক ‘গুরু’ সাখাওয়াত হোসেন খানের সাথে চরম দূরত্ব তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ‘সভাপতি’ পদপ্রার্থী হওয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাখাওয়াত বিরোধী বলয়ের সমর্থন ও নিজস্ব জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান কোন উচ্চতায় পৌঁছায়, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর।
আদালতপাড়ার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও আইনজীবী সমাজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়ন এবং অ্যাডভোকেট রিফাতের ভূমিকা ও অবদান চোখে পড়ার মতো। সাধারণ আইনজীবীদের বিভিন্ন সংকটে পাশে থাকা ও পেশাগত অধিকার রক্ষায় তাদের সরব উপস্থিতি আইনজীবী অঙ্গনকে সব সময় চাঙ্গা রেখেছে। সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সক্রিয়তা অব্যাহত রেখেছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার সিনিয়র ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট বারী ভূইয়া অতীত থেকেই আদালত অঙ্গনের প্রতিটি সংকট নিরসনে মধ্যপন্থী, অভিভাবকতুল্য ও গঠনমূলক অবদান রেখে আসছেন। তবে সাম্প্রতিককালে আদালতপাড়ার উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট ও হাতাহাতির ঘটনার সমাধানের লক্ষ্যে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানালেও তাতে কেউ সাড়া দেননি। প্রবীণ এই আইনজীবীর আহ্বানে কারো কর্ণপাত না করা এবং একপ্রকার ‘মূল্যহীন’ মনে করে এড়িয়ে চলার বিষয়টি আদালতপাড়ার শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রবীণ আইনজীবীদের তীব্রভাবে ব্যথিত করেছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ও আদালতপাড়ার অভ্যন্তরীণ বলয় তৈরিতে অ্যাডভোকেট আজিজ মোল্লা, গালিব এবং জাকিরের সক্রিয়তা এখন বেশ দৃশ্যমান। সাখাওয়াত ও আনোয়ার-জাকির বলয়ের টানাটানির মাঝে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ আইনজীবী সমিতি ও ফোরামের নেতৃত্বে মাঝারি ও তরুণ সারির এই উদীয়মান নেতারা নিজেদের কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কার পাল্লা ভারী করেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী হিসাব-নিকাশ।
এদিকে সম্প্রতি আদালতপাড়ায় গুঞ্জন ছড়ায় যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি সুমন নিজের পদ ও প্রভাব বজায় রাখার তাগিদে অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধানকে ‘ম্যানেজ’ করার এক গোপন উদ্যোগে নেমেছেন। খবর চাউর হয়েছে, এই জটিল পরিস্থিতি সমাধান এবং সমঝোতা ও ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় নেপথ্য কারিগর হিসেবে মধ্যস্থতা করছেন রাসেল প্রধান। এই সমঝোতার খবরের গুঞ্জন চাউর হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনজীবী মহলে নতুন আলোচনা ও কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের আগামী দিনের নেতৃত্বের দৌড়ে কারা আসছেন—তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। কোর্টপাড়ার সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং বলয়ভিত্তিক সমঝোতার প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের শীর্ষ পদে অ্যাডভোকেট খোরশেদ মোল্লা (সাবেক স্পেশাল পিপি) এবং বর্তমান পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের আসার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফোরামের নেতৃত্ব এই দুই নেতার হাতে গেলে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার রাজনীতি নতুন রূপ পাবে এবং শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে বলেই মনে করছেন সাধারণ আইনজীবীরা।
নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, পিপি পদ নিয়ে বিতর্ক এবং আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতিতে যদি শেষ পর্যন্ত আনোয়ার প্রধান (সভাপতি) ও জাকির হোসেন (সাধারণ সম্পাদক) পদে সমিতিতে চলে আসেন এবং সুমনের চেয়ার সুরক্ষিত হয়, তবে সাখাওয়াত হোসেন খান এবং তাঁর সাথে থাকা আজিজ মোল্লা ও গালিবদের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে কোর্টপাড়ার রাজনীতি নিয়ে একাধিক বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত জাকির হোসেন সাধারণ সম্পাদক হন এবং আনোয়ার প্রধান সভাপতি পদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন, তবে এটা স্পষ্ট হবে যে—সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুসারী আজিজ মোল্লা ও গালিবদের মতো রাজপথ ও বারের সক্রিয় মাঠপর্যায়ের নেতাদের মূলত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সাখাওয়াত বলয়ের এই নেতাদের ত্যাগ কেবল ‘কুরবানি’ বা রাজনৈতিক গুটি হিসেবেই গণ্য হবে। রাজনৈতিক শিষ্যের (আনোয়ার প্রধান) কাছে নিজের আধিপত্য হারানো এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পদে নিজের পছন্দের পূর্ণ বলয় বসাতে না পারা সাখাওয়াত হোসেন খানের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে মারাত্মক ধাক্কা দেবে।
স্পেশাল পিপি সুমনের নিয়োগ ঠেকানো এবং সাবেক স্পেশাল পিপি খোরশেদ মোল্লার অধিকার বা বারের স্বার্থ রক্ষার নাম করে যে বিরোধ ও লড়াই শুরু হয়েছিল, সুমন চেয়ারে বসে গেলে সেই পুরো আন্দোলনের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা শূন্যে মিলিয়ে যাবে। সুমনকে ম্যানেজ করার বা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে যদি সমঝোতা হয়, তবে এতে আনোয়ার প্রধান রাজনৈতিকভাবে আরও একধাপ এগিয়ে যাবেন। প্রমাণিত হবে যে, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আনোয়ার প্রধান যা চেয়েছেন, সেটাই বাস্তবায়িত হয়েছে।
সমিতির নির্বাচনে যদি আনোয়ার প্রধান সভাপতি এবং জাকির হোসেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নারায়ণগঞ্জ কোর্টপাড়ায় সাখাওয়াত হোসেন খানের দীর্ঘদিনের একক প্রভাবের সমাপ্তি ঘটবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে “আনোয়ার-জাকির” যুগের সূচনা হবে। একদিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে বার সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা জাকির হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ার শীর্ষে নিয়ে যাবে। এতদিন ধরে যে সাধারণ আইনজীবীরা সাখাওয়াতের ডাকে রাজনৈতিক সংঘাত ও সমঝোতাবিরোধী অবস্থানে শামিল হয়েছিলেন, তারা নিজেদের চরম প্রতারিত মনে করবেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, যদি এত দ্বন্দ্ব, হট্টগোল এবং রক্তচাপ বাড়ার পর শেষ পর্যন্ত সুমন স্পেশাল পিপি হিসেবে স্থায়িত্ব পান এবং সমিতির নির্বাচনে আনোয়ার প্রধান ও জাকির হোসেন মনোনীত হয়ে বার শাসন করেন—তবে মাঠের লড়াইয়ে নামা আজিজ মোল্লা ও গালিবদের অবস্থান হবে রাজনৈতিকভাবে ‘বলির পাঁঠা’ হওয়ার শামিল। এটি সাখাওয়াত হোসেন খানের মাস্টারপ্ল্যানের চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং আদালতপাড়ার রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে আনোয়ার-জাকির বলয়ের হাতে।

কোর্ট প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:৫৬ অপরাহ্ণ