বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত ও সড়ক শৃঙ্খলায় ফেরানোর প্রতিটি চেষ্টাই যেন এক অঘোষিত সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার স্মৃতি এখনো নগরবাসীর মনে তাজা। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের চিরচেনা চিত্র বিন্দুমাত্র বদলায়নি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নবনিযুক্ত প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ফুটপাত উচ্ছেদে গিয়ে হকারদের রোষানলে পড়ে লাঞ্ছনা ও হামলার চেষ্টার শিকার হয়েছেন।
আইভীর পর সাখাওয়াত—ব্যক্তি বদলালেও দৃশ্যপট অপরিবর্তিত থাকার পেছনে নেপথ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালী বলয়কেই দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু সড়ক ও শায়েস্তা খাঁ সড়কে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযানে যান নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও তার সঙ্গীয় কর্মীরা। উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতেই ক্ষুব্ধ হকাররা সংগঠিত হয়ে প্রশাসক ও তার কর্মীদের ঘিরে ধরে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে তারা উত্তেজিত হয়ে সাখাওয়াত হোসেনকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে এবং উচ্ছেদ কর্মীদের ওপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে হকাররা তাদের মালামাল রাস্তায় ফেলে বিক্ষোভ শুরু করে। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনাসূত্রে দেখা যায়, পুলিশের উপস্থিতি বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছাড়া আকস্মিক রাতের বেলা অভিযান চালানোয় এ অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার মহড়া ও সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ফুটপাত মুক্ত করার লক্ষ্যে চাষাঢ়ায় এলে তার ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়।
তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থক ও হকারদের যৌথ হামলায় সেদিন চাষাঢ়া চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মেয়র আইভীর ওপর নির্বিচারে গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, যেখানে মেয়রকে বাঁচাতে গিয়ে তার সমর্থক ও সাংবাদিকসহ অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। সেদিনের হামলাটি ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সরাসরি মদদে পরিচালিত, যা ক্ষমতার জোর দেখিয়ে শহরের অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার নগ্ন উদাহরণ।
দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে দুই জনপ্রতিনিধি/প্রশাসকের ওপর একই ধরনের হামলার ঘটনার পেছনের মূল কারণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়।
নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ও আশপাশের এলাকাগুলোতে শত শত হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলে একশ্রেণির প্রভাবশালী চক্র। সরকার বা প্রশাসনিক পরিবর্তন হলেও এই চাঁদাবাজ চক্রের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। ফলে হকার উচ্ছেদ হলে এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে যায়, যা সিন্ডিকেট কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না।
অতীত ও বর্তমান—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা ও কর্মসূচি পালনে এই বিশাল হকার সমাজকে ‘ভোট ব্যাংক’ ও ‘প্যাদা বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ এলেই হকারদের সামনে ঠেলে দিয়ে পেছনের সিন্ডিকেট ফায়দা লোটে।
আইভীর আমলে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা মেলেনি। আবার বর্তমান প্রশাসকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুলিশ প্রশাসনকে পর্যাপ্ত আগাম তথ্য না দিয়ে অভিযানে নামায় নিরাপত্তা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো দৃশ্যমান রোডম্যাপ তৈরি না করায় উচ্ছেদের পরপরই হকাররা অস্তিত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে এবং সহিংস রূপ নেয়।
নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত কেবল পথচারীদের চলাচলের রাস্তা নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াইয়ের ময়দানে। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী থেকে শুরু করে বর্তমান প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান—যারাই ফুটপাত মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তারাই এই অবৈধ চক্রের মুখোমুখি হয়েছেন। এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির রুট বন্ধ করতে না পারলে এবং পুলিশ-প্রশাসনের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ না থাকলে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত কখনোই সাধারণ মানুষের দখলে আসবে না।

শহর প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:১৯ অপরাহ্ণ