নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের এক অজোপাড়া গাঁয়ের সাধারণ যুবক মোঃ আলামিন গাজী। একসময় যার পরিচিতি ছিল অতি সাধারণ হিসেবে, তিনি আজ বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক। রাতারাতি আলামিনের এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে মাদকের আন্তর্জাতিক পাচার সিন্ডিকেট ও মানব পাচারের বিশাল সাম্রাজ্য। বিভিন্ন তথ্য ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার অপরাধ জগতের চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর নানা কৌশল।
আলামিন গাজীর আয়ের প্রধান উৎস হলো মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান দেশ ও বিদেশে পাচার করা। পাচারের জন্য তিনি বেছে নেন নিত্যনতুন ও অভিনব পন্থা। অনুসন্ধানের বের হয়ে আসে সাধারণ কোনো ব্যথানাশক বা অন্যান্য নিরাময়কারী ওষুধের মোড়ক কিনে এনে তার ভেতরে সুকৌশলে ইয়াবা ট্যাবলেট কাইটের মতো করে প্যাকেটজাত করা হয়।
গ্রামের দরিদ্র, বিদেশগামী কিংবা ঘুরতে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের বিমান টিকিট ও ঘোরাঘুরির খরচের প্রলোভন দেখানো হয়। তাদের দিয়ে ওষুধের প্যাকেটের কথা বলে এসব ইয়াবার চালান বিদেশে পাঠানো হয়। তাছাড়া দেশের বিমানবন্দরগুলোর অসৎ চক্রকে ম্যানেজ করার পাশাপাশি কখনো কখনো নদীপথে জাহাজের মাধ্যমেও মাদকের চালান নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো হয়।
বেশ কিছুদিন আগে আলামিন গাজীর পাঠানো ৫ জন সহযোগী বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ সৌদি আরব পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সেখানকার কারাগারে বন্দি হন। তবে মূল হোতা আলামিন গাজী চতুরতার পরিচয় দেন। বিশাল অঙ্কের টাকা ছিটিয়ে ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজেকে এবং মূল সিন্ডিকেটকে রক্ষা করে কৌশলগতভাবে সৌদি আরব থেকে দেশে পালিয়ে আসেন। একজন সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক হয়েও দেশের বিমানবন্দরে অলৌকিক ভিআইপি সুবিধা পান তিনি, যা নিয়ে সচেতন মহলে চরম বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।
কেবল ইয়াবাতেই সীমাবদ্ধ নয় আলামিনের অপরাধের জাল। অনুসন্ধানে জানা গেছে ভালো চাকরির কথা বলে বা প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারীকে বিদেশে দেহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে পাচার করেছেন তিনি। অঢেল ও অবৈধ টাকার গরমে তিনি একাধিক বিবাহ করেছেন এবং বিলাস বহুল জীবনযাপন করছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন, ঠিক তখন আলামিন গাজীর মতো অপরাধী কার ক্ষমতাবলে পার পাচ্ছেন—তা নিয়ে আড়াইহাজারজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও আলামিন গাজী প্রশাসনের একটি অসাধু অংশকে মাসোহারা ও সুবিধা দিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার মাদক সাম্রাজ্য চালিয়েছেন। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব ও ব্যবসা এখনো কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে, তা এক বড় প্রশ্ন।
পুলিশ, ডিবি, র্যাব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তাৎক্ষনিক হস্তক্ষেপে আলামিন গাজীকে আইনের আওতায় আনতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ অন্যান্য পয়েন্টে আলামিন গাজীকে যারা ‘ভিআইপি সেবা’ প্রদান করেছে এবং কার্গো/যাত্রী স্ক্যানিং এড়িয়ে মাদক পারাপারে সহায়তা করেছে, তাদের কল রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা।
সৌদিতে বন্দি থাকা ৫ তরুণের পরিচয়, তাদের পাসপোর্ট নম্বর এবং কার মাধ্যমে তারা টিকিট পেয়েছিলেন—সেই ব্যাংকিং ট্রানজেকশন ও টিকেট বুকিং এজেন্সির লিংক ধরে এগোলে আলামিনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে।
আড়াইহাজার বা ঢাকার স্থানীয় যেসব প্রেসিং বা প্যাকেজিং সোর্স থেকে ওষুধ কোম্পানির ভুয়া বা আসল মোড়ক সরবরাহ করা হয়, সেখানে অভিযান চালানো। কালাপাহাড়িয়া ও আড়াইহাজারের স্থানীয় কোন কোন বিকাশ/নগদ এজেন্ট বা হুন্ডি কারবারির মাধ্যমে আলামিনের মাদকের টাকা লেনদেন হয় এবং বিদেশে টাকা যায়, তা ট্র্যাক করা। আলামিন গাজী ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল এবং তিনি আয়কর ঠিকমতো দিচ্ছেন কিনা তার বিস্তারিত অডিট করা।
কালাপাহাড়িয়াসহ সমগ্র আড়াইহাজারের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে এই ‘ইয়াবা সম্রাট’ আলামিন গাজীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। নেপথ্যের সকল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মদদদাতাদের মুখোশ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৫৫ অপরাহ্ণ